মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী:: মাঠের ধান রক্ষা করতে গিয়ে রক্তে রঞ্জিত হলো কৃষকের আঙিনা। ঘাম আর শ্রমে বোনা স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত যমদূত হয়ে দেখা দিল জহুর উদ্দিনের জীবনে। দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের সুঁড়িগাঁও গ্রামে এখন বারুদজ্বলা স্তব্ধতা; যেখানে ফসলের মায়ার চেয়ে মানুষের আক্রোশ বড় হয়ে উঠেছে।
গত পহেলা মে শুক্রবার সকাল। ভরা বৈশাখে যখন সোনালি ধানে মাঠ ভরে ওঠার কথা, ঠিক তখন তুচ্ছ এক বাকবিতণ্ডায় নিভে গেল ৫ সন্তানের জনক ৫৫ বছর বয়সী জহুর উদ্দিনের জীবনপ্রদীপ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নিজের পরম মমতায় ফলানো ধানি জমিতে প্রতিপক্ষের গরু ঢোকার প্রতিবাদ করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই প্রতিবাদই কাল হলো। প্রতিপক্ষের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিজের আবাদি জমির বুকেই লুটিয়ে পড়েন এই নিরপরাধ কৃষক।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বারান্দায় যখন জহুর উদ্দিনের নিথর দেহ পড়ে ছিল, তখন স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদে হাসপাতালের বাতাসও যেন ভারী হয়ে ওঠে। এক মুঠো ধানের অধিকার কি তবে জীবনের চেয়েও দামি? এই প্রশ্ন এখন সুঁড়িগাঁওয়ের প্রতিটি ঘরে। বিকেলের নিভে আসা আলোয় নিহতের বাড়িতে যে শোকের ছায়া নেমেছে, তা যেন কেবল এক ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং মানবিকতার এক চরম অপমৃত্যু।
উল্লেখ্য, পহেলা মে শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে সুঁড়িগাঁও গ্রামের মৃত হযরত আলীর পুত্র জহুর আলীর জমিতে গরু দিয়ে ধান খাওয়ানো নিয়ে একই গ্রামের কফিল উদ্দিন মাস্টারের পুত্র উজ্জ্বল ও ফয়সাল আহমদের সাথে বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে প্রতিপক্ষের লোকজন সংঘবদ্ধ হয়ে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে জহুর আলীকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দোয়ারাবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালের বারান্দায় ভাইয়ের নিথর দেহের পাশে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতের বোন ও ইউপি সদস্য হোসনে আরা বেগম। গগনবিদারী আর্তনাদে তিনি বলেন, 'এক মুঠো ধানের জন্য আমার ভাইকে এভাবে কুপিয়ে মারল ওরা? ভাই তো শুধু নিজের ফসলটুকু বাঁচাতে চেয়েছিল। আমরা এই রক্তপাতের বিচার চাই, খুনিদের ফাঁসি চাই।' তার এই বুকফাটা হাহাকারে উপস্থিত সবার চোখ ভিজে ওঠে। এক মুঠো ধানের অধিকার কি তবে জীবনের চেয়েও দামি হয়ে উঠল? এই প্রশ্ন এখন সুঁড়িগাঁওয়ের প্রতিটি ঘরে।
নিহতের পুত্র আল আমিন কান্নায় ভেঙে পড়ে বাবার খুনীদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি চেয়েছেন। গরু দিয়ে ধান খাওয়াতে নিষেধ করাই তার পিতার কাল হয়ে দাঁড়ালো।
দোয়ারাবাজার থানার ওসি তরিকুল ইসলাম জানান, সংবাদ পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে একজনকে আটক করা হয়েছে। মামলার প্রস্তুতি চলছে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আইনের খাতায় বিচার হবে, হয়তো সাজাও মিলবে। কিন্তু যে কৃষকের ছোঁয়ায় মাঠের ফসল কথা বলত, সেই চেনা মানুষটি আর কখনো ফিরবে না। হাওরের হাহাকার আর স্বজনদের অশ্রুজলে মিশে রইল কেবল একটিই দীর্ঘশ্বাস— ‘মাঠের ধান মাঠেই রইল, কেবল কৃষকই পরপারে পাড়ি জমালো।